মুম্বাইয়ের লোকহান্ডওয়ালার একটি অ্যাপার্টমেন্টে ২০১২ সালের ৭ এপ্রিল রাতে শোনা গিয়েছিল এক বৃদ্ধের আর্তচিৎকার। প্রথম তলার জানালা দিয়ে প্রাণ বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছিলেন তিনি। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী দেখেন, এক ব্যক্তি তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে বারবার আঘাত করছে। কিছুক্ষণ পর পর্দার রড ভেঙে গেলে বৃদ্ধ ঘরের ভেতরে পড়ে যান। পরে পুলিশ বাথরুম থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে। নিহত ব্যক্তি ছিলেন অভিনেতা অনুজ টিক্কুর বাবা অরুণ টিক্কু।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এটি ছিল শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; বরং বলিউডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পরিচয় জালিয়াতি, বন্ধুত্বের ফাঁদ এবং সম্পত্তি দখলের একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় হত্যাকারীরা
প্রত্যক্ষদর্শী হারাঙ্গাদ সিং মাইনি নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে ফ্ল্যাটে গেলে দরজা খুলে এক ব্যক্তি দাবি করেন, ভেতরে সামান্য ঝগড়া হয়েছে, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু তার শরীরে রক্তের দাগ ছিল। ফ্ল্যাটে ঢুকে মাইনি আরও একজনকে দেখতে পান, যার পায়েও রক্ত লেগে ছিল। সন্দেহ হওয়ায় নিরাপত্তারক্ষীরা বাইরে থেকে ফ্ল্যাটটি তালাবদ্ধ করে পুলিশে খবর দেন।
প্রায় আধা ঘণ্টা পরে পুলিশ এসে দেখে, অভিযুক্তরা বাথরুমের জানালা ভেঙে পালিয়ে গেছে।
নিহতের পরিচয়, নিখোঁজ ছেলে
ফ্ল্যাটের ভেতরে সর্বত্র রক্তের দাগ, ভাঙাচোরা আসবাবপত্র ও তছনছ অবস্থার মধ্যে বাথরুমে পাওয়া যায় অরুণ টিক্কুর মরদেহ। তাকে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল এবং গলায় কম্পিউটারের তার পেঁচানো ছিল।
তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে পুলিশ দেখতে পায়, সর্বশেষ কলটি হয়েছিল ছেলে অনুজ টিক্কুর সঙ্গে। কিন্তু অনুজের ফোন বন্ধ থাকায় সন্দেহের তীর প্রথমে তার দিকেই যায়।
পরে কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে পুলিশ গোয়ার পথে চিপলুন এলাকায় অনুজ ও তার বন্ধু পরিচয়ে থাকা করণ সুদকে আটক করে। তখনই অনুজ জানতে পারেন, তার বাবা খুন হয়েছেন।
অনুজ দাবি করেন, তিনি বন্ধুর সঙ্গে গোয়া গিয়েছিলেন এবং মুম্বাইয়ে কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।
করণ সুদ নয়, আসলে পলাতক খুনি
তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। করণ সুদ নামে যাকে অনুজ চিনতেন, তিনি আসলে করণ নন। তার প্রকৃত নাম বিজয় পালান্ডে, যিনি একাধিক মামলার আসামি এবং দণ্ডপ্রাপ্ত খুনি।
পুলিশ জানায়, পালান্ডে নিজেকে বিদেশে হোটেল ব্যবসার মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। অনুজের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সিমরান সুদ নামে এক নারী। পরে জানা যায়, তার আসল নাম সীমা দুসাঞ্জ এবং তিনি পালান্ডের স্ত্রী। যদিও অনুজকে বলা হয়েছিল, তিনি পালান্ডের বোন।
অনুজ বলেন, বলিউডে কাজের সূত্রে পরিচয়ের কারণে তিনি তাদের সন্দেহ করেননি। ধীরে ধীরে পালান্ডে তার আস্থা অর্জন করেন এবং তার সম্পত্তি সম্পর্কেও আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন।
আসল লক্ষ্য ছিলেন অনুজ
তদন্ত শেষে পুলিশ অনুজকে নির্দোষ ঘোষণা করে সরকারি সাক্ষী করে।
পুলিশের দাবি, মূল লক্ষ্য ছিলেন অনুজ টিক্কু। পরিকল্পনা ছিল, তার স্বাক্ষর নিয়ে সম্পত্তির কাগজপত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, তাকে গোয়ায় নিয়ে হত্যা করা এবং তার ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ দখল করা।
কিন্তু অরুণ টিক্কু মুম্বাইয়ে এসে ভাড়াটিয়াদের কাগজপত্র খতিয়ে দেখতে শুরু করলে ষড়যন্ত্রকারীরা পরিকল্পনা বদলে ফেলে। অনুজকে গোয়ার দিকে পাঠিয়ে অরুণকে একা রেখে হত্যা করা হয়।
ব্যাংকের লকারে মিলল ‘সুইসাইড নোট’
তদন্তের সময় বিজয় পালান্ডের একটি ব্যাংক লকার থেকে অনুজ টিক্কুর নামে একটি কথিত আত্মহত্যার চিঠি উদ্ধার হয়।
সেখানে লেখা ছিল, তিনি জীবনে সুখী নন এবং নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করা যাবে না।
পুলিশের অভিযোগ, অনুজকে হত্যা করার পর এই চিঠি প্রকাশ করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা ছিল।
তবে অনুজ দাবি করেন, তাকে মাদক মিশ্রিত বিয়ার পান করিয়ে জোর করে ওই চিঠি লিখিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তার প্রশ্ন ছিল, সত্যিকারের আত্মহত্যার চিঠি কেউ ব্যাংকের লকারে রেখে যায় কেন?
ভয়াবহ সেই রাত
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ শেষে অনুজ যখন বাবার হত্যাকাণ্ডের ফ্ল্যাটে ফিরে যান, তখনও রক্তের দাগ, ভাঙা আসবাবপত্র এবং হত্যার চিহ্ন রয়ে গিয়েছিল। তিনি পরে জানান, সেই ভয়াবহ অপরাধস্থলেই তিনি রাত কাটিয়েছিলেন।
ঘটনাটি কভার করা অপরাধবিষয়ক সাংবাদিক বিবেক আগারওয়াল বলেন, অনুজ ছিলেন অত্যন্ত সরল মানুষ। তার সীমিত সামাজিক যোগাযোগ এবং বলিউডে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংগ্রামই তাকে সহজ টার্গেটে পরিণত করেছিল। অভিযুক্তরা সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়েছিল।
রায় হলেও শেষ হয়নি লড়াই
অরুণ টিক্কু হত্যা মামলায় বিজয় পালান্ডে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন। একই মামলায় ধনঞ্জয় শিন্ডে ও মনোজ গাজকোশও সাজা ভোগ করছেন। সীমা দুসাঞ্জ তিন বছর কারাভোগের পর মুক্তি পেয়েছেন।
তবে অনুজ টিক্কুর দাবি, এখনও পুরোপুরি বিচার হয়নি। তিনি আশা করছেন, বিজয় পালান্ডের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেই তার বাবার প্রকৃত বিচার নিশ্চিত হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, এই মামলা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের নয়; এটি দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে ভুয়া পরিচয়, বিশ্বাস অর্জন এবং পরিকল্পিত প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের জীবন ও সম্পত্তি দখলের ভয়াবহ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
পরবর্তীতে আরেকটি আলোচিত হত্যা মামলাতেও বিজয় পালান্ডেকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সেই মামলায় নিহত হন চলচ্চিত্র প্রযোজক হওয়ার স্বপ্ন দেখা করণ কাক্কার, যিনি বন্ধুত্ব ও বলিউডে সুযোগের প্রলোভনে পালান্ডের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে।


